স্মৃতি তাঁকে তাড়িয়ে বেড়ায়

“আমি জান কারস্কি। আমার কিছু বলার আছে।”

১৯৪২ এর পোল্যাণ্ডের ওয়ারশ শহর। নাৎসি আর সোভিয়েত বাহিনীর আক্রমণে বিধ্বস্ত পোল্যাণ্ড। জান কারস্কি নামে এক ব্যক্তি পোল্যাণ্ডের গোপন প্রতিরোধ আন্দোলনের বার্তাবাহক হিসেবে কাজ করছেন। তিনি গোপনে ওয়ারশ’র ইহুদি বসতি ঘুরে এসেছেন যাতে মিত্রপক্ষকে জানাতে পারেন কীভাবে পোল্যাণ্ডে ইহুদি নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা চলছে। জান কারস্কি যুদ্ধ চলাকালীন সমগ্র ইউরোপ ঘুরেছেন। ইংরেজদের সতর্ক করেছেন। পোল্যাণ্ডের নির্বাসিত সরকারকে জানিয়েছেন। সমগ্র পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। কিন্তু কেউ তাঁর আবেদনে সাড়া দেননি। সমকালীন পৃথিবীর যেসব তাবড় শক্তিশালী নেতা জার্মানির ইহুদি নিধন রুখতে পারতেন, তাঁর সকলেই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। ১৯৪৪ সালে কারস্কি “গোপন রাষ্ট্রের কাহিনী: পৃথিবীর কাছে আমার প্রতিবেদন” নামে একটি বই লেখেন।

জান কারস্কি

এই ঘটনার পরে প্রায় চল্লিশ বছর মৌন থেকে কারস্কি ক্লোজ্ লাঞ্জমান এর সিনেমায় পুনরায় সেই নিষ্ঠুর বর্বরতার সাক্ষী হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছেন। লাঞ্জমান তাঁর চলচ্চিত্র ‘শোআহ্‌'(SHOAH) এর জন্য কারস্কির সাক্ষাৎকার নেন এবং সেই সিনেমায় পোল্যাণ্ডের নিধনক্ষেত্র থেকে মার্কিন রাষ্ট্রপতির কার্যালয় পর্যন্ত কারস্কির অবিশ্বাস্য যাত্রাপথের কাহিনী বিবৃত করেন।

মিত্রপক্ষের নিষ্ঠুরতা এবং নির্মম গণহত্যার সম্মুখীন হয়েও সাহসী এই মানুষটির অসাধারণ মানসিক দৃঢ়তায় অনুপ্রাণিত হয়ে ২০০৯ সালে ইয়ানিক হেনেল (Yannick Haenel) তিনটি অংশে বিভক্ত একটি উপন্যাস লেখেন যার প্রথম অংশে আছে পূর্বোক্ত সিনেমায় কারস্কির বক্তব্য, দ্বিতীয় অংশটি কারস্কির আত্মজীবনী এবং তৃতীয় অংশে ঔপন্যাসিকের কল্পনায় নায়ক বর্তমান কালে কথা বলছেন।

ফরাসি নির্দেশক আর্তুর নাউজিসিয়েল (Arthur Nauzyciel) এই উপন্যাসের মঞ্চরূপ দিয়েছেন। তাঁর কথায় “সাহিত্যের যদি সীমানা না থাকে, তাহলে থিয়েটারেরই বা তা থাকবে কেন?” মূলের প্রতি বিশ্বস্ত থেকে নাউজিসিয়েল দেখিয়েছেন কীভাবে চরিত্রের আরোপিত নৈঃশব্দ ভঙ্গ করে থিয়েটার একটি ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডির কাহিনী মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারে ঠিক সেই সময় যখন ইহুদি নিধনের শেষ সাক্ষীরা এই পৃথিবী থেকে অন্তর্হিত হচ্ছেন।

এই নাটক মঞ্চস্থ করতে নাউজিসিয়েল সেই সব দেশের শিল্পীদের সাহায্য নিয়েছেন যেখানে কারস্কি ভ্রমণ করেছিলেন: ফ্রান্স, বেলজিয়াম, পোল্যাণ্ড, সুইজারল্যাণ্ড, অস্ট্রিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এঁরা সকলেই কারস্কির পর্যটক যা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় এই কাহিনীটি একাধারে ইউরোপীয় ও মার্কিন এবং এতে মিশেছে কল্পনা ও বাস্তব। কারস্কির সাক্ষ্য নথিভুক্ত হয়েছে, বিভিন্ন দেশের লেখকেরা তাঁর কাহিনীকে উপন্যাস ও জীবনীর রূপ দিয়েছেন। এক পোলিশ ক্যাথলিকের এই জীবনকাহিনীর মঞ্চায়নের রূপকার একজন ফরাসি।

কারস্কির ঠাকুর্দা আর দাদু, তাঁর কাকা এবং খুড়তুতো ভাইবোনদের আউইশউইটজ্-এ চালান করা হলেও তাঁরা প্রাণে বেঁচে ফেরেন। ফরাসি ভাষায় এঁদের “প্রাণে-বেঁচে-যাওয়া” না বলে “পুনরাগত” বলা হয়েছে যার অর্থ হল তাঁরা ফিরে এসেছেন, কেউ আশা না করলেও প্রায় পরপার থেকে বেঁচে ফিরেছেন, অনেকটা ভূতের মত। আর্তুর নাউজিসিয়েল এর নাটক শুরু হয়েছে কারস্কির সাক্ষ্য দিয়ে। মনে রাখতে হবে কূটনৈতিক দক্ষতা ছাড়াও কারস্কির ছিল নায়কোচিত অসম সাহস। রুশ ও জার্মানদের হাতে ধরা পড়েও তিনি তাঁর জীবনে অসামান্য বুদ্ধি ও মনোবলের পরিচয় দিয়েছেন। আত্মপরিচয় গোপন করে রুশদের হাত থেকে মুক্তি পেলেও জার্মান গেস্টাপো কর্তৃক তিনি অত্যাচারিত হন। যাতে তাঁকে কথা বলতে বাধ্য না করা যায় তার জন্য তিনি নিজের কব্জি কেটে মৃত্যুবরণ করতে চেয়েছিলেন। হাসপাতাল থেকে রেজিস্টেন্স গ্রুপের সদস্যরা তাঁকে উদ্ধার করে। এরপরে পোল্যাণ্ডের গুপ্ত দলের সদস্যরা তাঁকে ওয়ারশ’র ইহুদি বসতি গোপনে কিন্তু সরেজমিনে প্রদর্শন করার অনুরোধ জানান যাতে প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য তাঁর প্রতিবেদনের অন্তর্ভুক্ত হয়। ইহুদি বসতির দুজন বন্দির সাক্ষ্য তিনি নথিভুক্ত করেন। যাঁরা বেঁচেও মরে আছেন সেই সব ইহুদি বন্দিদের চোখ দিয়ে কারস্কি ঘটনা প্রবাহ প্রত্যক্ষ করেছেন, নিজের হৃদয়ে সেই অভিজ্ঞতা উল্কির মত এঁকে নিয়েছেন।

নাটকের মহলা শুরু করার আগে নাউজিসিয়েল আর তাঁর সহকারীরা ওয়ারশ’র ইহুদি বসতি এবং আউশউইটজ্ ঘুরে দেখেন। যুদ্ধের অবসানে কারস্কি তাঁর জীবন নতুন করে গড়ে তোলেন। শিক্ষকতার পেশা বেছে নেন, বিবাহ করেন। কিন্তু রুজভেল্ট এর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের মুহূর্তটি স্মৃতিতে ফিরে ফিরে আসে। রাতের পর রাত তিনি জেগে কাটান এই ভয়ে যে তাঁর রচিত ইহুদি নিধনের সেই অবিশ্বাস্য আখ্যান যদি স্মৃতি থেকে অবলুপ্ত হয়ে যায়! তখনও ইহুদিদের পরিণতি তত অনিবার্য হয়ে ওঠেনি, রাষ্ট্রনেতারা তাঁর পরামর্শ শুনলে হাজার-হাজার ইহুদি প্রাণে বাঁচতেন। আর্তুর নাউজিসিয়েল এর ‘জান কারস্কি: আমার নামই একটি কাহিনী’ ২০১১ সাল থেকে ইউরোপের বিভিন্ন শহরে মঞ্চস্থ হয়ে আসছে। ফ্রান্সের আভিনিয়ঁ শহরের নাট্যউৎসবে নাটকটি দর্শকদের প্রভূত প্রশংসা অর্জন করে।

অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন যে হিটলারের ইহুদি নিধন যজ্ঞকে থামানোর একমাত্র উপায় ছিল নাৎসি জার্মানিকে যুদ্ধে হারানো। কিন্তু হলোকস্ট বন্ধ করার জন্য মিত্রপক্ষ কেন কোনো পরিকল্পনাই তৈরি করেনি?

এই ভয়ংকর নৈতিক প্রশ্নের উত্তর আজও মেলেনি।