পাত্রিক মোদিয়ানো: স্মৃতির শিল্প

Posted by on September 20, 2018 in প্রবন্ধ | 0 comments

১৯৬৮ সালে ‘লা প্লাস দ্য লেতোয়াল’ দিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল, যে যাত্রার মূল উপাদানগুলো ছিল রচনা, স্মৃতি ও বিস্মরণ। এই ডিসেম্বরে নোবেল পুরস্কার গ্রহণ অনুষ্ঠানে সেই যাত্রাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ফরাসি ঔপন্যাসিক পাত্রিক মোদিয়ানো বললেন: “এই অভিজ্ঞতা অনেকটা শীতের রাতে কালো বরফের ওপর দিয়ে গাড়ি চালানোর মত, যখন দৃশ্যমানতা প্রায় শূন্য। কিন্তু আপনার অন্য কোনো উপায় নেই, পেছনে ফেরার রাস্তা নেই, আপনাকে এগিয়ে চলতে হবে, নিজেকে এই বলে বোঝাতে হবে যে যাত্রা নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হবে, সমস্ত ঝড়ঝঞ্ঝা যাবে কেটে।” অথচ তাঁর উপরোক্ত প্রথম উপন্যাস, গোঁকুর পুরস্কারে ভূষিত ‘র‌্যু দে বুতিক ওবস্কুর’ থেকে শুর করে সাম্প্রতিকতম উপন্যাসটি পর্যন্ত মোদিয়ানোর যাত্রা মূলত পেছনের দিকে, অদূর বা সুদূর অতীতে। অতীতের অস্পষ্টতা ভেদ করাই তার লক্ষ্য, স্মৃতি তাঁর উপন্যাসে রেখে যায় সুস্পষ্ট পদচিহ্ন।

যেমন তাঁর ‘দোরা ব্রুদর’ উপন্যাসের উৎস সংবাদপত্রে প্রকাশিত একটি ছোট বিজ্ঞাপন। ১৯৮৮ সালে ৩১ ডিসেম্বর ১৯৪১ তারিখের ‘পারী সোয়ার’ সংবাদপত্রে পাত্রিক মোদিয়ানো দোরা ব্রুদর নামে একটি ১৫ বছরের ইহুদি কিশোরীর নিখোঁজ হয়ে যাওয়া সম্পর্কে মেয়েটির বাবা-মায়ের দেওয়া একটি বিজ্ঞাপন দেখতে পান। মেয়েটি কনভেণ্ট স্কুলের নিরাপদ আশ্রয় থেকে পালিয়ে যায়। মোদিয়ানোর অন্বেষণের সেই সূচনা। তিনি দোরা ব্রুদর সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ জানার চেষ্টায় অনুসন্ধান শুরু করেন। তৎকালীন জার্মানির অধীনস্থ ফ্রান্সের রাজধানী পারী শহর থেকে একটি ইহুদি মেয়ে স্কুলের অপেক্ষাকৃত নিরাপদ গণ্ডি ছেড়ে কেন পালায়? মেয়েটির নাম আরেকটি সরকারি নথিতে পাওয়া যায়। সেপ্টেম্বর, ১৯৪২-এ পারী থেকে যেসব ইহুদি বন্দিদের আউশউইটজ্ এর ক্যাম্পে চালান করা হয় সেই তালিকায় ছিল দোরার নাম।

line and wash sketch of a political rally

দোরার অতীত খুঁড়ে মোদিয়ানো তুলে নিয়ে আসেন সেই সময়ের ক্ষয়ক্ষতির হিসেব — হারিয়ে যাওয়া মানুষ, হারিয়ে যাওয়া কাহিনী আর ইতিহাস। দোরার গল্প বলতে বলতেই মোদিয়ানো আমাদের শোনান দশ বছর ব্যাপী তাঁর অনুসন্ধানের মর্মস্পর্শী কাহিনী যা তাঁকে জার্মানির দখলে থাকা পারী শহরের দৃশ্য আর ধ্বনির আবহে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। দোরার অস্তিত্বকে অতীতের কবর থেকে উদ্ধার করতে গিয়ে মোদিয়ানো অনুভব করেন যে তিনি আসলে সেই ঐতিহাসিক সময়ে অতিবাহিত তাঁর নিজের সমস্যাকীর্ণ শৈশব আর কৈশোরের সঙ্গে বোঝাপড়া করছেন। ‘দোরা ব্রুদর’ উপন্যাসটি হয়ে ওঠে সৃষ্টিশীল আর ঐতিহাসিক উপাদানের — বহু খণ্ডচিত্রের — পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থনা যার মাধ্যমে ফুটে ওঠে এক হারিয়ে যাওয়া সময় আর ক্ষয়ক্ষতির স্মৃতিরোমন্থন।

মোদিয়ানোর রচনাশৈলীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় উপাদানটি কী? তাঁর কণ্ঠস্বর, তাঁর বলার ভঙ্গি, তাঁর উপন্যাসের প্রতিবেশ বা আবহ যা ব্যাখ্যার অতীত, যা একেবারেই তাঁর নিজস্ব। প্রথম পংক্তি থেকেই আমরা আবিষ্কার করি একটি জীবন অথবা একাধিক জীবন, একটি পরিবেশ অথবা একটি দৃশ্য আর অনেক প্রশ্ন। আমরা দ্বিধাগ্রস্ত এক কথকের সঙ্গে যাত্রা শুরু করেছি। সেই আখ্যায়কের স্মৃতি প্রখর অথচ দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। সেই কাহিনীকারের সঙ্গে আমরা ঘুরে বেড়াই পারীর রাস্তায়, তার অলিগলিতে — স্মৃতি আর বিস্মৃতির আলোছায়া আমাদের তাড়িয়ে বেড়ায়। মোদিয়ানোর কণ্ঠস্বর অবশ্যই আজকের ফ্রান্সে অন্যতম সুন্দর স্বর। কোন্ যাদুকাঠির ছোঁয়ায় তিনি জীবন্ত করে তোলেন রহস্য আর বিষণ্ণতায় পরিপূর্ণ অতীতের মায়াবী প্রতিচ্ছবি? আর এই প্রক্রিয়ায় সঞ্জীবিত হয়ে বহু নামহীন সত্তা লাভ করেন পাঠকের আন্তরিক সহৃদয়তা আর ভালোবাসা।

ঔপন্যাসিক হিসেবে পাত্রিক মোদিয়ানোর অনুসন্ধান অনেকটা ডিটেকটিভের মত। তিনি যেন একটি বিস্তারিত ধাঁধার বহু ছোট ছোট অংশের উত্তর খুঁজছেন। তাঁর উপন্যাস নামহীন, পরিচয়হীন কিছু মানুষের অনুপুঙ্খ আত্মজীবনী। তিনি সেই সব মানুষের জীবন নিয়ে গবেষণায় নেমেছেন অতীতে যাঁদের অস্তিত্ব ছিল, কিন্তু যাঁরা চলে যাওয়ার সময় প্রায় কোনো চিহ্নই রেখে যাননি। লেখকের কাজ হল ওই যৎসামান্য সূত্র ধরে এগোনো — একটা জন্ম তারিখ, একটা গাড়ি চালকের লাইসেন্স। তাঁর উপাদান পুরোনো সংবাদপত্র, টেলিফোন ডাইরেক্টরি, সরকারি নথিপত্র। “এই পৃথিবীর বুকে একজন মানুষের অস্তিত্বের যতটুকু প্রমাণ আমি খুঁজে পাই, তাই সংগ্রহ করি,” মোদিয়ানোর ডিটেকটিভ ব্যাখ্যা করেন,”আর আমি যতটা সম্ভব তাঁদের গোটা জীবনের ভ্রমণসূচি অনুসরণ করি, যাতে তাঁদের আরও ভালো বুঝতে পারি।”

এই অন্বেষণে নেমে মোদিয়ানো মূলত নৈঃশব্দ্যের মুখোমুখি হন। “আমাদের জীবনে নির্দিষ্ট কিছু মৌনতা, কিছু শূন্যতা আছে — অপেক্ষার পুনরাবৃত্তি, অনিয়মিত চাকরি, নির্দিষ্ট মাতৃভূমির অনুপস্থিতি, পরিচয়ের অস্বচ্ছতা, হোটেলে বসবাস, ভ্রমণকালীন সাময়িক বন্ধুত্ব। এমন কিছুই নয় যার ওপর ভিত্তি করে একটি কাহিনী গড়ে তোলা যায়।” লেখকের কৃতিত্ব হল তিনি এই অজ্ঞাত, অপরিচিত মানুষদের আমাদের সামনে নিয়ে আসেন। মোদিয়ানোর উপন্যাস ‘লা রোঁদ দ্য ন্যুই” সম্পর্কে লিখতে গিয়ে ব্রুনো দুসি বলেছেন যে মোদিয়ানোর কাহিনী এই অজ্ঞাতপরিচয় মানুষগুলোকে দ্বিতীয়বার বাঁচার সুযোগ করে দেয় — দেয় একট দ্বিতীয় অস্তিত্বের স্বাদ। তিনি হারিয়ে যাওয়া মানুষদের বিস্মৃতির জগত থেকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন।

২০১৪ সালে সাহিত্যের নোবেল পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে মোদিয়ানোর বক্তৃতার সূত্র ধরে এই সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধের সূচনা। পাত্রিক মোদিয়ানোর জন্ম ১৯৪৫ এর পারীতে, যে শহরে তখনও জার্মান আক্রমণের স্মৃতি সজীব ছিল। “সেই সময়ের পারীর অধিবাসীরা কেউ সেই শহরের কথা দ্রুত ভুলে যেতে পারেননি। আমাদের বাবা-মায়ের মৌন মুখগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে আমরা বুঝতে পারতাম যে আমাদের পূর্বে জীবন কেমন ছিল।”

স্মৃতিভ্রংশতা আর বিস্মৃতির বিরুদ্ধে ধারাবাহিক এই লড়াইয়ের ফসল হল ‘র‌্যু দে বুতিক ওবস্কুর’ অথবা ‘অ্যাঁ পেদিগ্রে’ এর লেখকের রচনাসম্ভার। নোবেল কমিটি তাঁকে “সমকালের প্রুস্ত” এই অভিধায় অভিহীত করেছেন কারণ তিনি হারিয়ে যাওয়া সময়ের আধুনিক রূপকার। লেখক নিজে অবশ্য বলছেন, “আমার মনে হয় আজকাল আমার স্মৃতি অনেক কম প্রত্যয়ী।” অতি সামান্য তথ্যকে সম্বল করে তিনি রচনা করেন কালের ইতিহাস। তাঁর নিজের ব্যাখ্যায় অর্ধেক মুছে যাওয়া শব্দকে পুনরুদ্ধার করে তা থেকে অতীত নির্মাণ করা সমুদ্রের ওপরে সামান্য ভেসে থাকা হিমশৈলগুলোকে আবার জাগিয়ে তোলার মত কঠিন।

এই শেষ কথাটি বলে নোবেল বক্তৃতা সম্পূর্ণ করে সত্তর ছুঁই ছুঁই লাজুক লেখক কয়েক মুহূর্ত মাথা নিচু করে তাঁর লিখে আনা পৃষ্ঠাগুলোর ওপর ঝুঁকে রইলেন, তৈরি করলেন বুক দুরদুর করা নৈঃশব্দ্য। তারপরে মুখ তুলে প্রথম বারের জন্য প্রেক্ষাগৃহের সমবেত শ্রোতাদের দিকে তাকিয়ে এমনভাবে হাত নাড়লেন যেন বলতে চান “এই সব! আমার ঝুলিতে আর বিশেষ কিছু অবশিষ্ট নেই।” এই বলে জনসাধারণের বিচারের কাছে নিজেকে সঁপে দিতেই প্রেক্ষাগৃহ হাততালিতে ফেটে পড়ল।

(এই প্রবন্ধের জন্য উপাদান সংগৃহীত হয়েছে মূলত ‘ল্য ফিগারো’ এবং ‘ল্য মোঁদ’ নামের দুটি প্রখ্যাত ফরাসি সংবাদপত্র থেকে।)

                                                                                                                                       

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *