কবি মিলটনের নায়ক কি সন্ত্রাসবাদী?

Posted by on September 20, 2018 in প্রবন্ধ | 0 comments

জীবদ্দশায় ইংরেজ কবি ও পুস্তিকাকার জন মিলটনকে নানা অভিধায় ভূষিত করা হয়েছে: স্বর্গীয় উদ্দীপনায় অনুপ্রাণিত, ঈশ্বরনিন্দুক, কঠোর নীতিপরায়ণ, দুশ্চরিত্র, স্তাবক, মতপ্রচারক এবং বিপ্লবী। ১৬৭৪ সালে কবির মৃত্যুর পর থেকেই বহু শতক ধরে এই কবিকে বিধর্মী থেকে গোঁড়া খ্রিষ্টান পর্যন্ত বিভিন্ন বিশেষণ প্রয়োগে বর্ণনা করা হয়েছে। অথচ কবির নিজের কথায় তিনি ছিলেন মানুষের মধ্যে ঈশ্বরের পথের ন্যায্যতা প্রতিপন্ন করায় সদা সচেষ্ট। এরিওপেজিটিকা‘র লেখককে যেমন বাকস্বাধীনতার রক্ষক বলা হয়েছে, তেমনই নিজের পত্নীদের ওপর অত্যাচার আর কন্যাদের স্বার্থসাধনে কাজে লাগানোর অপরাধে অপরাধী বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। মিলটনের কবিতায় বিশেষত ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অনুষঙ্গ সতত যুক্ত হওয়ার এই প্রবণতা লক্ষ্য করে টি. এস. এলিয়ট বলেছিলেন, “আর কোনো কবির কবিতাকে শুধু কবিতা হিসেবে বিবেচনা করা এতটা কঠিন নয়।”

২০০২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে একটি ঐতিহ্যশালী ও সম্মানীয় ব্রিটিশ সাহিত্য সমালোচনা পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধে কবি মিলটন এর বিরুদ্ধে একটি নতুন অভিযোগ আনা হয়েছে। ওই প্রবন্ধে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মিলটন-বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক জন কেরি মিলটনের বিয়োগান্ত কাব্য-নাটক স্যামসন অ্যাগনিস্টেস-কে ‘সন্ত্রাসবাদের প্ররোচক’ এবং ওই নাটকের নায়ক অন্ধ ইজরেলাইট স্যামসনকে আধুনিক আত্মহননকারী সন্ত্রাসী বা সুইসাইড বোম্বার এর সঙ্গে তুলনা করেছেন, কারণ স্যামসন অসীম শক্তিতে ভর করে ফিলিস্টাইনদের মন্দিরের স্তম্ভগুলোকে ভেঙে ফেলে নিজের এবং বহু সহস্র নাগরিকের জীবনের আকস্মিক সমাপ্তি ঘটিয়েছিলেন।

এইখানে মিলটনের নাটকের কাহিনী সম্পর্কে আমাদের স্মৃতি একটু ঝালিয়ে নেওয়া যেতে পারে। মিলটন এর নাটকের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল বাইবেল এর বুক অব দ্য জাজেস-এ স্যামসন এর জীবনের শেষ পর্যায় যখন তিনি ফিলিস্টাইনদের হাতে বন্দি, উপরন্তু অন্ধ। বস্তুত স্যামসন এর জীবনের এই পর্যায়ের সঙ্গে নাটক রচনার সময় স্বয়ং কবি মিলটন এর জীবনের অদ্ভুত সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। গাজা’র কারাগারে বন্দি স্যামসন এর সঙ্গে দেখা করে তাঁকে সান্ত্বনা দিতে এসেছেন তাঁর নিজের জনগোষ্ঠীর সদস্য বন্ধুরা যাঁরা এই নাটকের কোরাস। এরপরে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করছেন তাঁর পিতা মানোয়া যিনি পুত্রের মুক্তির জন্য সচেষ্ট এবং আশাবাদী। এইভাবে নিজ স্ত্রী ডেলাইলা এবং অন্যান্য অতিথিদের সঙ্গে সাক্ষাতের পর শেষমেষ তাঁর ডাক পড়ে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের ভোজসভাতে ফিলিস্টাইন রাজাদের বিনোদনের উদ্দেশে নিজ শক্তির প্রদর্শনে। মন্দিরে গিয়ে স্যামসন শারীরিক শক্তি প্রদর্শনের অছিলায় মন্দিরের স্তম্ভগুলিকে টেনে নামান, ঘটিয়ে দেন বিধ্বংসী হত্যালীলা যাতে স্বয়ং নায়কও প্রাণ বিসর্জন দেন।

লণ্ডন থেকে প্রকাশিত দ্য টাইমস লিটারেরি সাপ্লিমেণ্ট-এ আমেরিকার নিউ ইয়র্ক এর ১১ই সেপ্টেম্বর এর সন্ত্রাসের বর্ষপূর্তি সংখ্যায় অধ্যাপক কেরি জানিয়েছেন যে আমেরিকায় ওই ঘটনাটি সংঘটিত হওয়ার পরে বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে বাইবেলের চরিত্র স্যামসন এর সঙ্গে আমেরিকার বিমান ছিনতাইকারী আল-কায়দা গোষ্ঠীর সন্ত্রাসবাদীদের সাদৃশ্য বারংবার তাঁকে মানসিকভাবে ত্রস্ত করে তুলত। কেরি লিখেছেন, “ওই বিমান ছিনতাইকারীদের মত স্যামসনও নিজ লক্ষ্য অর্জনে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন। তাঁদের মত স্যামসনও বহু নিরাপরাধ মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছিলেন যাঁদের জীবন, আশা বা প্রেম সম্পর্কে ব্যক্তিগতভাবে তাঁর কোনো ধারণাই ছিল না।” প্রোফেসর কেরি এই ভেবে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন যে মিলটন যে আন্তরিক সহানুভূতি ও প্রগাঢ় অনুকম্পার সঙ্গে তাঁর নায়কের চরিত্রটি গড়ে তুলেছেন, তাতে সাধারণভাবে এই নাটকটি স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য করা উচিত হবে কি না। বলা বাহুল্য অক্সফোর্ড এর অধ্যাপকের এই বক্তব্য প্রবল বিতর্কের সৃষ্টি করেছে যার সাক্ষ্য আজ পর্যন্ত ঐতিহ্যশালী ওই পত্রিকাটির চিঠিপত্রের পৃষ্ঠাগুলি বহন করে চলেছে।

বস্তুত অধ্যাপক কেরি’র প্রবন্ধের মূল লক্ষ্য ছিল শিকাগোর ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্ট্যানলি ফিশ এর একটি মন্তব্য। অধ্যাপক ফিশ এর মতে ফিলিস্টাইন রাজা-রাজড়াদের হত্যা, যাঁরা মিলটন এর ভাষায় ছিলেন নির্বাচিত অভিজাতশ্রেণী এবং সমাজের শ্রেষ্ঠাংশ, হল ঈশ্বরিক ইচ্ছার কবিকৃত বর্ণনা এবং যেহেতু এই বর্ণনার মাধ্যমে কবি সেই ইচ্ছার প্রকাশ ঘটাচ্ছেন, তাই স্যামসন এর এই পদক্ষেপটিকে নৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে গণ্য করতে হবে। নাটকের ঘটনা পরম্পরার নিরিখে অন্য কোনো মূল্যায়ন যথার্থ নয়।

কোনো কোনো সাহিত্য সমালোচকের মতে সাহিত্যে অতীতের ঘটনাবলীর উপস্থাপনায় রাজনৈতিক ন্যায়-অন্যায় বিচার্য বিষয় হতে পারে না। সাহিত্যের পাঠক এই বিতর্কে কার্থাজিনিয়ান, কনফেডারেট, ফিলিস্টাইন ইত্যাদি যে কোনো গোষ্ঠীর সমর্থক হয়ে উঠতে পারেন। অন্য অনেকে সামগ্রিকভাবে মিলটন এর রচনার মধ্যে ঈশ্বরের প্রতি আনুগত্যের বিষয়টিকে অন্য সব প্রতিপাদ্য বিষয়ের ঊর্ধ্বে রেখে বিচার করতে চান, তা মহাকাব্যিক রচনা, ধর্মীয় নথি, ইংল্যাণ্ডের গৃহযুদ্ধ সম্পর্কিত অতিপ্রগতিবাদী পুস্তিকা ইত্যাদি যাই হোক না কেন। তবে অধ্যাপক ফিশ শেষ পর্যন্ত বিষয়টিকে পাঠকের বিবেচনার ওপর ছেড়ে দিয়ে বলেছেন যে যদি কেউ মিলটন এর রচনায় এমন রাজনৈতিক তাৎপর্য অথবা চিরন্তন হৃদয়াবেগ খুঁজে পেতে চান যার সঙ্গে আলোকপ্রাপ্ত ও কুসংস্কারমুক্ত আধুনিক মানুষ একমত হতে পারেন, তাহলে মিলটন এর রচনা সমস্যার কারণ হতে পারে।

অর্থাৎ বিতর্ক চলবে। অধ্যাপক কেরি’র প্রবন্ধটি প্রকাশিত হওয়ার তেরো বছর পরেও টাইমস লিটারেরি সাপ্লিমেণ্ট এর সম্পাদকের দপ্তরে বিক্ষুব্ধ পাঠকদের টেলিফোনের বিরাম নেই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *