আটা কেন খাবেন না

Posted by on September 20, 2018 in স্বাস্থ্য | 0 comments

প্রথমেই বলে নেওয়া ভালো যে, আমি ডাক্তার, বদ্যি, নার্স, পুষ্টিবিদের মধ্যে কোনোটাই নই। কাজেই খাদ্যের গুণাগুণ অথবা শরীর ও চিকিৎসা সম্পর্কে কোনও কথা বলার এক্তিয়ারই আমার নেই। এই প্রবন্ধে যা বলা হল, তার সবটাই পড়ে, শুনে জানা আর কিছুটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাপ্রসূত।

আপনি কি ডায়াবেটিস অথবা উচ্চ-রক্তচাপে ভুগছেন? নানারকম পেটের অসুখ, গ্যাস, অম্বল, বদহজম, ঘন ঘন মলত্যাগের ইচ্ছা কি লেগেই থাকে? নিজের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে কি আপনি হিমশিম খান? হঠাৎ হঠাৎ শারীরিক অথবা মানসিক দুর্বলতা কি আপনাকে গ্রাস করে? তাহলে মন দিয়ে পড়তে থাকুন।

উইলিয়াম ডেভিস (William Davis) নামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ সম্প্রতি ‘হুইট বেলি’ (Wheat Belly) নামে একটি বই লিখেছেন। ড. ডেভিসের মতে আধুনিক মানুষ অল্প বয়স থেকেই যেসব সাধারণ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে তার অনেকগুলির কারণ নিহিত রয়েছে আমাদের খাদ্যাভ্যাসে। তার চেয়েও বড় কথা এই সব সমস্যার মূল কারণ একটি অতি ব্যবহৃত খাদ্যশস্য — গম।

ড. ডেভিস বলছেন, গম বা আটা শরীরে রক্তশর্করার পরিমাণ বাড়ায় চিনির থেকেও বেশি। গমের মধ্যে গ্লুটেন (gluten) নামে যে প্রোটিন থাকে মানুষের পরিপাকতন্ত্র তা হজম করতে অক্ষম। এই প্রোটিন শরীরে প্রবেশ করে নানারকম অ্যালার্জির কারণ ঘটায় যার মধ্যে আছে বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগ ও হাঁপানি। গম থেকে তৈরি খাদ্য অন্ত্রের খাদ্য শোষণকারী আস্তরণ বিনষ্ট করে হজম শক্তি নষ্ট করে। আটা থেকে তৈরি খাবার শরীরে ক্ষতিকর লো ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন (LDL)-এর পরিমাণ বাড়ায়। শতকরা এক ভাগ মানুষের ক্ষেত্রে গমের অভ্যন্তরীণ ‘গ্লুটেন’ প্রোটিন পাকতন্ত্রের এমন ক্ষতি করে যে তাঁদের এক কণা আটাও সহ্য হয় না। এঁরা সিলিয়াক (Celiac) রোগে আক্রান্ত হন। অন্ত্রের আস্তরণের ক্ষতি হওয়ার ফলে আংশিক হজম হওয়া খাবার রক্তে প্রবেশ করে এবং স্নায়বিক ব্যাধি থেকে শুরু করে আর্থরাইটিস এর মত হাড়ের রোগ অথবা সিজোফ্রেনিয়ার মত মানসিক ব্যাধিরও কারণ হতে পারে।

ড. ডেভিসের মতে প্রত্যেক মানুষের শরীরেই আটার অনুপ্রবেশ ঘটলে অ্যালার্জি প্রতিক্রিয়া হয়। তবে এর পরিমাণ কারও ক্ষেত্রে বেশি, কারও কম। আপনার ক্ষেত্রে অ্যালার্জির পরিমাণ কতটা তা বোঝার সবচয়ে সহজ উপায় হল এক মাস (৩০ দিন) আটা থেকে তৈরি সব খাবার বর্জন করা। এর ফলে যদি আপনার রোগলক্ষণগুলো কমে আসে অথবা রোগ আংশিক বা সম্পূর্ণ নিরাময় হয়, তাহলে বুঝতে হবে যে, ভবিষ্যতে আপনার পক্ষে আটার তৈরি সব খাবার বর্জন করাই শ্রেয়। তবে মনে রাখতে হবে যে বার্লি অথবা রাই এর মত আরও কিছু দানাশস্যেও গ্লুটেন থাকে। তাই গমের সঙ্গে ওগুলোও বর্জনীয়।

ড. ডেভিস বলেছেন যে, মানুষের গম জাতীয় দানাশস্য খাওয়ার ইতিহাস মোটামুটি দশ হাজার বছরের যা এই পৃথিবীতে মানুষের অস্তিত্বকালের এক শতাংশ মাত্র। গম সেই দানাশস্য যা নিয়ে মানুষ বিশেষত আধুনিক যুগে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে। এই সব পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলে যে শংকর প্রজাতির অধিক ফলনশীল গমের চাষ আজ থেকে আনুমানিক পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে মেক্সিতোতে প্রথম শুরু হয়, তা পৃথিবীব্যাপী মেদবাহুল্য, ডায়াবেটিস, উচ্চ-রক্তচাপ ইত্যাদি সমস্যার অকস্মাৎ বিস্ফোরণের পিছনে অন্যতম প্রধান কারণ।

আমাকে অনেকেই প্রশ্ন করেন, “আটার খাবার বাদ দিলে খাব কী?” আমার মতে চিরাচরিত ভেতো বাঙালির আটাবিহীন জীবনে ধাতস্থ হতে বিশেষ অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য ড. ডেভিসের মতে চালই হল সেই দানাশস্য যা ক্ষতিকারক নয়, তবে তা খেতে হবে পরিমিত পরিমাণে, শরীরে ক্যালোরির চাহিদার কথা মনে রেখে।

ড. ডেভিস কী ধরনের খাদ্যাভ্যাসকে আদর্শ বলেছেন? পর্যাপ্ত পরিমাণ শাক-সব্জি, বিভিন্ন ধরনের বাদাম (কাঠবাদাম, কাজুবাদাম, আখরোট), ফল (আম, কাঁঠালের মত মিষ্টি ফলের পরিমাণ খুব সীমিত রাখতে হবে), দিনে একবার দুধ অথবা দুধের খাবার অথবা অন্যান্য প্রাণীজ প্রোটিন। প্রত্যেকবার খাবারের সঙ্গে অলিভ, নারকেল তেল, ঘি এর মত স্বাস্থ্যসম্মত তেল এক চা-চামচ পরিমাণ খেতে পারলে ভালো। এর ফলে আপনার শরীরে খাদ্য ধীরে ধীরে হজম হবে, হঠাৎ রক্তে শর্করার পরিমাণ অত্যধিক বাড়বে না। ভাত, আলু, রাঙাআলু, কাঁচাকলা, ওল, কচুর মত নিরাপদ কার্বোহাইড্রেট খেতে পারেন আপনার শরীরে ক্যালোরির প্রয়োজন অনুযায়ী। ভাজাভুজি, বাইরের খাবার, চিনি থেকে তৈরি খাবার সম্পূর্ণ বাদ দিতে পারলেই ভালো হয়।

সকলের পক্ষে এতটা ‘আত্মত্যাগ’ অসম্ভব মনে হলেও, এক মাস আটার খাবার সম্পূর্ণ বাদ* দিয়ে দেখুন। ঠকবেন না। যেমন ঠকেননি এখনকার বিশ্বজয়ী টেনিস খেলোয়াড় নোভাক জোকোভিচ। নোভাকের ডায়েট সম্পূর্ণ গমবর্জিত। সে গল্প আরেকদিন বলা যাবে।

=================================================

  • বিঃ দ্রঃ এর অর্থ হল এই সময় আটা বা ময়দার তৈরি কোনও খাবার (যেমন লুচি, পরোটা, কচুরি, বিস্কুট, কেক ইত্যাদি যাবতীয় খাদ্য) খাওয়া চলবে না।

=================================================

তথ্যসূত্র:

  1. Wheat Belly: Lose the Wheat Lose the Weight; William Davis M.D., Rodele, USA

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *